আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি মানুষের জন্যে বিপদজনক হয়ে উঠছে?
আরও পড়ুন -চাঁদের বুক থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি
এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মূলত চ্যাটজিপিটি নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে আসার পর। ভাষাভিত্তিক এই চ্যাটবট তার তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে প্রায় সব প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারে।
চ্যাটজিপিটি রচনা লিখতে পারে, চাকরির বা ছুটির আবেদন, যেকোনো রিপোর্ট তৈরি করতে পারে, এমনকি গান ও কবিতাও লিখতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্ষমতা দেখে সারা বিশ্বের প্রযুক্তি বিষয়ক নীতি-নির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং নির্বাহীরা নড়ে চড়ে বসেন। এক হাজারের মতো ব্যক্তি এক খোলা চিঠিতে এই প্রযুক্তির ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গবেষণায় এখনই রাশ টেনে না ধরলে সমাজ ও মানবজাতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আরও পড়ুন -চাঁদকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য, বিজ্ঞানীরা সেই রহস্যের সন্ধানে আছেন
কেন এই ভীতি?
আয়ারল্যান্ডের একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহমুদ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হেলথ-গ্রুপের একজন প্রকৌশলী এবং এই প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বলছেন এই ভয় অনেকটাই মানসিক।
“এটা হচ্ছে অজানাকে ভয় পাওয়ার মতো ভয়,” বলেন তিনি।
নাসিম মাহমুদ বলছেন, “ধরা যাক আমরা একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দায়িত্ব দিলাম প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়ার জন্য। সে লিখেও দিল। তার এই লেখা পর্যন্ত আমরা অনেকভাবে পরীক্ষা করে নিলাম। এর ভালো দিকটা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় যা আমাদের বর্তমান সময়ের এথিকসের সাথে সংঘাতপূর্ণ, তখন কী হবে!
“এই ভুল তো মানুষও করেছে। কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে আমরা এই জায়গাতে দেখতে চাই না,” বলেন তিনি।
চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআই নিয়ে উদ্বেগ ঠিক এই কারণেই। এই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সুলিখিত উত্তর তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে একজন ছাত্রকে সুশিক্ষিত করে তোলার যে মূল লক্ষ্য সেটা ব্যাহত হতে পারে।
হঠাৎ কেন আলোচনা?
প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর গাণিতিক তত্ত্ব অনেক আগে আবিষ্কার হলেও, এই বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের জন্য ম্যাথম্যাটিক্যাল মডেলের অভাব ছিল।
আরও পড়ুন -চাঁদে মুখ থুবড়ে পড়েছে রাশিয়ার চন্দ্রযান লুনা-২৫, ব্যর্থ হলো অভিযান
কিন্তু গত কয়েক বছরে কম্পিউটিং পাওয়ার বৃদ্ধির পাশাপাশি, এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে ওঠার কারণে এই খাতের নেতারা এর নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক থাকতে চাইছেন।
ঢাকায় একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন বলছেন, প্রত্যেক দশ বছরে কম্পিউটিং-এর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু এই প্রযুক্তি মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছে, এবং সেসব তথ্য মানুষের চেয়েও দ্রুত গতিতে প্রসেস করতে পারছে, তার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপরে এর প্রভাব পড়ছে।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি তো মানুষের জন্য সুখবর। তাহলে এ নিয়ে এতো উদ্বেগ কেন?
“একটা কারণ হচ্ছে মানুষের যেসব কাজ তার একটা বড় অংশ আগামীতে মেশিনের হাতে চলে যাবে।
অনেক জায়গাতে সেটা হয়েও গেছে। ফলে একটা হচ্ছে কাজ হারানোর ভয়। আরেকটা ভয় হচ্ছে এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের আশঙ্কা,” বলেন মি. স্বপন।
তিনি বলছেন এধরনের ভয়ের মধ্যে রয়েছে: ফেক নিউজ, ফেক ইভেন্ট, এমনকি ফেক রিলেশনশিপ।
“আরো যে বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠতে পারে সেটা হচ্ছে বৈষম্য। আমরা একসময় বলতাম ডিজিটাল ডিভাইড।
যার কাছে প্রযুক্তি আছে এবং যার কাছে প্রযুক্তি নেই তাদের মধ্যকার এই গ্যাপ নিয়ে আমরা কয়েক দশক ধরেই সোচ্চার ছিলাম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষে মানুষে, সমাজে সমাজে এবং দেশে দেশে এই বিভাজন এখন আরো বেড়ে যাবে,” বলেন তিনি।
আরও পড়ুন -সিআইএ’র গোপন অভিযান, বহু ইউএফও উদ্ধার
চাকরি খেয়ে ফেলবে?
আরো একটি শঙ্কার কারণ হচ্ছে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে অনেক মানুষের চাকরি হুমকির মুখে পড়বে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে সারা বিশ্বে ৩০ কোটি মানুষের চাকরি খেয়ে ফেলবে এআই। আরেকটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ আশঙ্কা করছে যে আগামী তিন বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তারা চাকরি হারাবেন।
তাহলে কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের জন্যে ভয়ের কারণ হতে পারে? গুগলের একজন টেকনিক্যাল ম্যানেজার তানজিম আহসান বলছেন, এটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।
“ভয়ের কারণ কিছুটা থাকতেই পারে। কারণ এর ফলে মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনেক জায়গাতেই কমে যাবে,” বলেন তিনি।
“আপনি যদি ১০০ বছর আগে ঘোড়ার গাড়ির চালক হতেন, দেখতেন যে হঠাৎ করে একটা গাড়ি এসেছে যাকে প্রতিদিন খাওয়াতে হয় না, পরিষ্কার করতে হয় না, তার ক্লান্তি নেই ঘুম নেই, সারা দিন চলতে পারে, সেই ঘোড়ার চালক তো তখন ভয় পেতেন, তার কাজ আজকের দিনে চলেও গেছে।
কিন্তু এর ফলে কি প্রচুর লোকের অন্ন বাসস্থান চলে গেছে? যারা একাজ করতো তাদেরটা চলে গেছে, কিন্তু গাড়ি আসার ফলে নতুন নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।”
আরও পড়ুন - আসছে ডিজিটাল ‘কলিগ’, হারাতে হবে যেসব চাকরি
মি. আহসান মনে করেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যতোই অগ্রগতি হোক না কেন মানুষের প্রয়োজন কখনোই ফুরাবে না। কারণ এসব কিছুই করা হচ্ছে মানুষের জন্য।
ইসময়/ইস/এমআরএম