সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ভারত বিরোধী মনোভাব বা 'অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান সেন্টিমেন্ট' এক নতুন এবং তীব্র রূপ লাভ করেছে। যদিও এই মনোভাব নতুন নয়, তবে এর বর্তমান ব্যাপকতা ও প্রখরতা অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারণ সম্মিলিতভাবে এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক কারণ:
এই সেন্টিমেন্টের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। সমালোচকদের মতে, ভারতের বর্তমান সরকার বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে একতরফাভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অনেকে মনে করেন। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে ভারতের অবস্থান এই ধারণাকে আরও উস্কে দিয়েছে। এর ফলে একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধিতা রাজনৈতিক বিশ্বাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বাণিজ্য ঘাটতি:
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি বিপুল। বাংলাদেশ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে পণ্য আমদানি করলেও সেই অনুপাতে রপ্তানি করতে পারে না। এর পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর অতি নির্ভরশীলতাকেও অনেকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেন। অতীতে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পেঁয়াজ বা চালের মতো পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তাদের ধারণা, ভারত তার বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশকে জিম্মি করে রাখে। এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং অসম প্রতিযোগিতা স্থানীয় শিল্পের জন্য হুমকি—এমন ধারণাও ভারত-বিরোধী মনোভাবকে শক্তিশালী করেছে।
সীমান্ত সমস্যা ও পানি বণ্টন চুক্তি:
দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি একটি संवेदनशील ইস্যু। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কৃষি ও পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এই চুক্তির বাস্তবায়নে ভারতের দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। এর সাথে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনা আগুনে ঘি ঢেলেছে। এই ঘটনাগুলো জাতীয়তাবোধে আঘাত করে এবং ভারত সম্পর্কে একটি আগ্রাসী প্রতিবেশীর ভাবমূর্তি তৈরি করে।
সামাজিক মাধ্যম ও 'ইন্ডিয়া আউট' প্রচারণা:
হঠাৎ করে এই মনোভাবের তীব্রতা বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে ‘#IndiaOut’ এবং ‘#BoycottIndianProducts’-এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এই মনোভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান, সংগঠিত এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পূর্বে যে ক্ষোভটি মানুষের মনে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারত-বিরোধী এই তীব্র মনোভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনুভূতি এবং অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোর সম্মিলিত ফল। সামাজিক মাধ্যম এই অনুভূতিকে একটি সংগঠিত রূপ দিয়ে এর ব্যাপকতা ও প্রখরতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।