রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কুমিল্লার বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল)-এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি এসব অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাতের আঁধারে কথিত নথি পোড়ানো এবং সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, যা নতুন করে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, বিভিন্ন নথি এবং একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ইমাম উদ্দিন, ডিজিএম (কমন সার্ভিস) শহিদুল ইসলাম, পার্সোনাল শাখার ব্যবস্থাপক কবিরুল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ২০২৩ তারিখে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযোগ দাখিলের পরও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পার্সোনাল শাখার ব্যবস্থাপক আওয়ামী দোষর কবিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। একই প্রতিষ্ঠানে টানা ১৭ বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার বিষয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এইদিকে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বিজিডিসিএলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কমন সার্ভিস) শহিদুল ইসলামের নামে ও বেনামে আয়-সামঞ্জস্যহীন বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটের ৪ নম্বর সেক্টরে তাঁর নামে একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, যা তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস ও মালিকানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা চলছে।
এছাড়া, অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কুমিল্লার চৌয়ারা এলাকায় বিচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ পুনরায় চালুর নামে অর্থ আদায়, স্থানীয় পূর্বে আমোদ এবং বর্তমানে বিসমিল্লাহ হোটেল মালিকের মাধ্যমে বাখরাবাদের কর্মকর্তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত গ্যাস অন্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে নতুন করে একটি সূত্র দাবি করেছে, সম্প্রতি রাতের আঁধারে প্রতিষ্ঠানের মসজিদের পশ্চিম পাশে, অফিস এলাকার বাইরে কিছু কাগজপত্র পোড়ানো হয়েছে। তবে কী ধরনের কাগজ পোড়ানো হয়েছে, কারা পোড়িয়েছে এবং এর সঙ্গে কোনো সরকারি নথির সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। অভিযোগকারীরা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে গেলে সাংবাদিকদেরও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান ফটকে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেন। ফলে তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া ব্যাহত হয়।
এছাড়া, ড্রাইভার মেহেদী হাসান শিমুল ও আরিফ হোসেনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া, পরবর্তীতে তার ডোপ টেস্টের ফল নেগেটিভ আসা এবং আহত এক চালক চাকরিতে বহাল থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ইমাম উদ্দিন, ডিজিএম (কমন সার্ভিস) শহিদুল ইসলাম এবং পার্সোনাল শাখার ব্যবস্থাপক কবিরুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বরং বিভিন্ন মাধ্যমে সাংবাদিকদের ম্যানেজের চেষ্টা করেন চায়ের দাওয়াত দেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ, কথিত নথি পোড়ানোর ঘটনা এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা হোক। তাদের মতে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।