চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ অভিনব। কারণ, তখন দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ পদের মধ্যে একমাত্র কার্যক্ষম ব্যক্তি ছিলেন রাষ্ট্রপতি। বহাল ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জনাব ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে তাদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন কি না, এই মর্মে বিদ্যমান সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের উপদেশমূলক মতামত চান। সুপ্রিম কোর্ট ইতিবাচক মতামত দেন। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের এই উপদেশ গ্রহণ করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ পড়ান।
বিভিন্ন সাংবিধানিক পদধারী যে শপথ গ্রহণ করেন, সেটাও বিদ্যমান সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের বিধানমতে তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত শপথ। যেহেতু বিগত শেখ হাসিনা সরকার ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে, কাজেই প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টাদের শপথবাক্যও সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, মুহাম্মদ ইউনূস সরকার তাহলে কোন শপথ পাঠ করলেন? উত্তর হলো, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টারা যে শপথ পাঠ করতেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা সেই শপথ পাঠ করেন। সুতরাং এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূলত বিদ্যমান সাংবিধানিক রীতি মেনে শপথ নিয়েছে।
আবারও প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদ্যমান সংবিধানবহির্ভূত শপথ গ্রহণ করার জন্য এই সরকার কি বৈধ না অবৈধ? এ বিষয়ে উভয় দিকেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা সম্ভব। এই বিষয়ে আমি সরাসরি উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকছি।
বাস্তবতা হচ্ছে, একটি ক্রান্তিকালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এমন জরুরি ও ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সাংবিধানিক বিধান আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ ও চতুর্থ তফসিলে রয়েছে। আমি এর আগে অনেক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি বলেছি, লিখেছি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই সরকারের সব কার্যক্রম, এমনকি পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন পর্যন্ত সময়কালের বৈধতা দিতে গেলেও সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে। সে ক্ষেত্রে সমাধান হলো বিদ্যমান সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া বা অধিকতর সংশোধন করা।
এখন প্রশ্ন হলো, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? আমি আগেই উল্লেখ করেছি, পরবর্তী সংসদ গঠিত হওয়ার পর অবশ্যই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে। আর কিছু না হোক, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কার্যক্রমে বৈধতা প্রদানের জন্য হলেও এটি করতে হবে। আমার সুস্পষ্ট মতামত হলো, জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ, এর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টিসহ সবকিছুই সেই সংশোধনীর মাধ্যমে করা সম্ভব এবং সেটিই বাস্তবসম্মত হবে।