সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তার প্রয়োজন হয় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গেলে, আর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন এ কারণেই ব্যবসায়ীরা কখনো কখনো। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান এমন মন্তব্য করেছেন। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামে আয়োজিত ইআরএফ সংলাপে ৫ জানুয়ারি (বুধবার) রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশে ব্যবসা করার জন্য রাজনৈতিক নিরাপত্তাবলয় কেন প্রয়োজন হয়, ফারুক হাসান এমন প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন । এ সময় তিনি রাজনীতি নয় অর্থনীতিতেই থাকতে চান বলেও মন্তব্য করেন অর্থনীতির মানুষ পরিচয় দিয়ে।
বিজিএমইএর (তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন) সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, তারা উদ্বিগ্ন নন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে যাওয়া নিয়ে। কারণ ইতিমধ্যে বিজিএমইএ সরকার ও ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়।
দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ বাড়ানো, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে আপাতত কোনো সংশয় দেখা যাচ্ছে না কোটা ও শুল্ক মুক্ত সুবিধাহীন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের টিকে থাকা নিয়ে। এস এম রাশিদুল ইসলাম (সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক) আয়োজিত সংলাপটি পরিচালনা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি ও বার্তা সংস্থা এএফপির ব্যুরো চিফ শফিকুল আলম।
ফারুক হাসান বলেন, বর্তমানে তাদের কৌশল হচ্ছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল অর্থাৎ ২০২৬ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা নেওয়া। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন(ইইউ) ২০২৬ সালের পরে যে বাড়তি তিন বছর শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধায় রপ্তানির সুযোগ দেবে, আলোচনার মাধ্যমে তা বাড়ানো। বিজিএমইএ ইইউর কাছে ১০ বছরের জন্য এই সুবিধা চায়।
এরপরে বিজিএমইএ ইইউর সঙ্গে জিএসপি প্লাস নিয়ে আলোচনা করবে। তবে পোশাক মালিকরা চান এই সময়ের মধ্যে সরকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে মুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করবে। তিনি আরও বলেন, বিজিএমইএ সব সময় পুরো খাতের উন্নয়নে কাজ করেছে, এখনো করে চলেছে। এই সংগঠনটিতে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা সকলেই পোশাক শিল্পের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।
তিনিও উত্তরসূরিদের মতো করে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবিলায় পোশাক খাতের এসএমই প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করতে বিভিন্ন ধরনের চার্জ ও ফি কমানো হয়েছে। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের কাজ চলছে।
কৃত্রিম তন্তুর পোশাক যাতে দেশে বেশি তৈরি হয় সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গবেষণা জোরদার করা হয়েছে। এক কথায় বিজিএমএর ভুমিকা ভবিষ্যৎমুখী করার চেষ্টা চলছে।প্রারম্ভিক বক্তব্যের পরে বিজিএমইএ সভাপতির কাছে উপস্থিত সাংবাদিকরা এ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা, করোনা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
যুক্তরাষ্টের বাজারে জিএসপি বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃহত্তম এই বাজারে তৈরি পোশাক জিএসপি সুবিধা পেত না। এখনও পাচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেসব শর্ত দিয়েছিল সেগুলো পোশাক মালিকরা ও সরকার বাস্তবায়ন করেছে। নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করতে এদেশের উদ্যোক্তারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন।
১৫৩টি গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে দেশে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা তাদের কাজটি করেছেন। এখন জিএসপি দেওয়া না দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়। তিনি বলেন, দেশটির জিএসপি সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে শুধু শর্ত বাস্তবায়ন নয়, রাজনীতিও জড়িত। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। আগামীতে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের র্যাব ও সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ব্যবসায় পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ব্যবসায়ীরা চিন্তিত। তবে ব্যবসায়ীদের কাজ তারা করছেন। আমরা কোনো বাজার হারাতে চাই না। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্ক, র্যাব ও র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার প্রতি আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা,
আগামী বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আগামী নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা যে কারখানায় উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়, এমন কোনো কর্মসূচি যাতে তারা না নেয়। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে সেই পরিবেশ থাকতে হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না ব্যবসা করতে গেলে রাজনৈতিক আশীর্বাদ লাগে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স ২০ থেকে ৩০ বছর আগে নেওয়া। তিন দশক আগে বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য তৈরি করত এখন তার চেয়ে ভিন্ন ও উন্নত পণ্য তৈরি করছে। ফলে পুরনো বন্ড লাইসেন্সে অনেক পণ্যেরই উল্লেখ নেই।
কিন্তু ওই লাইসেন্সধারী কারখানার নতুন পণ্যের প্রয়োজন হচ্ছে। তিনি বলেন, লাইসেন্সে উল্লেখ না থাকলেও ব্যবহারিক ঘোষণাপত্রে (ইউডি) তা থাকছে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পণ্য ছাড় করছে না। এতে ব্যবসা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এ নিয়ে আগামী সপ্তাহে রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করা হবে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে অভিযোগ করেন যে, ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার, পণ্য, ডিজাইনে যাচ্ছেন না। কিন্তু যাওয়ার সুযোগ কোথায়। কাস্টমসের জটিলতার মতো অনেক জটিলতার পেছনে ব্যবসায়ীদের দৌড়াতে হয়। ফলে এ ধরনের বিধিবিধান সহজ করে দিলে ব্যবসা সহজ হবে। করোনার প্রভাব মোকাবেলার প্রণোদনার ঋণ পরিশোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক কারখানা ইতিমধ্যে ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ের রপ্তানি বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সভাপতি বলেন, প্রথমত বেড়েছে আমদানি মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে। এ ছাড়া করোনার সময়ে ক্রেতাদের অনেক দাবি দেশের রপ্তানিকারকরা রেখেছেন। বিশেষ করে পরে ডেলিভারি, দেরিতে মূল্য পরিশোধ, ডিসকাউন্ট ইত্যাদি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
যেকারণে ক্রেতাদের সঙ্গে রপ্তানিকারকদের একটি সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে এখন ক্রেতারা তাদের বাড়তি চাহিদার পণ্য বাংলাদেশ থেকেই নিচ্ছেন। এ ছাড়া করোনার কারণে মানুষের ভ্রমণসহ অন্যান্য ব্যয় কমেছে। ফলে পশ্চিমারা তাদের অন্য খাতের অর্থ পোশাক কেনায় ব্যয় করছে। পোশাকের সামগ্রিকভাবে মূল্য সামান্য বাড়লেও কাটিং ও মেকিং চার্জ বাড়েনি।
আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রকৃত পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকের সংখ্যা প্রকাশ করা হবে। সাব কন্ট্যাক্টের বিষয়ে বিজিএমইএ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আগামীতেও থাকবে বলে তিনি জানান। তাজরিন ফ্যাশনের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি তারা চান না, কারণ হিসেবে বলেন। অবশ্যই সাব কন্ট্রাক্ট হবে, তবে তা একই ক্রেতার পণ্য উৎপাদন করে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এবং ক্রেতার সম্মতি সাপেক্ষে। যেসব কারখানা বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সদস্য হয়নি, তাদের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক করার নিয়ম দাবি করেন বিজিএমইএ'র সভাপতি নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য।
এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে নেওয়ারও চেষ্টা চলছে পোশাক কারখানা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে। এ জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে দক্ষ কর্মী।এ ছাড়াও সেসব কারখানাকে ব্যাংক ঋণ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান বিজিএমইএ সভাপতি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।