২০২৪সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। সারা দেশের মতো সিলেটেও চলছিল তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন। জুমার নামাজ শেষে মিছিল, স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকার মধুবন মার্কেট চত্বর। ঠিক তখনই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব।
তুরাব সেই সময় দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার শরীরে স্পষ্টভাবে "সাংবাদিক" লেখা চেস্টগার্ড এবং মাথায় হেলমেট ছিল। তবুও তাকেই লক্ষ্য করে চলে ৯৮ রাউন্ড গুলি—ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তরুণ সাংবাদিকের দেহ। ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান।
নিহত তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ (জাবুর) এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সিলেট মহানগর দায়রা আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, উপকমিশনার, ওসি, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
ভাইয়ের নির্মম মৃত্যুকে এখনো মেনে নিতে পারেন না জাবুর। তিনি বলেন, "আমার ভাইয়ের গায়ে স্পষ্ট 'সাংবাদিক' লেখা ছিল, মাথায় হেলমেট। তবুও কেন তাকেই টার্গেট করে গুলি চালানো হলো? সংবাদ সংগ্রহ করাটাই কি তার অপরাধ?"
আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, "আন্দোলনের এক বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনো আসামিরা ধরা পড়েনি, বিচারও শুরু হয়নি। এই সরকার না করলে কি অন্য সরকার বিচার করবে?"
তুরাব ছিলেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা, প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুর রহিমের ছোট ছেলে। তার বাবা বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ছিলেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তুরাব ছিলেন সবার ছোট। মাত্র দুই মাস আগে, ২০২৩ সালের ১২ মে, তার বিয়ে হয়েছিল লন্ডনপ্রবাসী তানিয়া ইসলামের সঙ্গে।
তুরাবের মা মমতাজ বেগম আজও ছেলের কথা মনে করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মাঝে মাঝেই বড় ছেলে জাবুরকে প্রশ্ন করেন, "আসামিরা কি ফাঁসি পাবে না?" কিংবা, "আসামিদের ধরা হয়েছে?" এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত জাবুর নিজেই এখন প্রশ্ন ছুড়ে দেন—"যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, সেটাই কি পেলাম?"
এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ টি এম তুরাবের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় পরিবারসহ সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—এই বিচার কি আদৌ হবে?
সিলেটের সকল পর্যায়ের সাংবাদিক আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেন দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নিয়ে জানান কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানান।