সব সময় সব খানে


মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

সব সময় সব খানে!
মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
**সদ্যপ্রাপ্ত

>> সিরাজগঞ্জে আমবোঝাই ট্রাক খাদে, ব্যবসায়ী নিহত

>> তাড়াশে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, স্বামীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ

>> বন্ধুদের সঙ্গে গোসলে নেমে আর ফেরা হলো না সিয়ামের

>> খাল খনন শেষে বিপুল পরিমাণে টাকা ফেরত দিয়ে প্রশংসা কড়িয়েছেন দুই ইউএনও

>> হাতীবান্ধায় ফিলিং স্টেশনে মিলছে না পেট্রোল-অকটেন, কর্তৃপক্ষের দাবি ‘সরবরাহ বন্ধ’

>> বকশীগঞ্জে ২০০ অসহায় পরিবারের মাঝে ৩০ কেজি করে জিআর চাল বিতরণ

>> সিরাজগঞ্জে ট্রাক-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী গুরুতর আহত, ঢাকায় রেফার্ড

>> সিরাজগঞ্জে বাস চালককে জরিমানা করায় সড়ক অবরোধে বাজার স্টেশনে তীব্র যানজট

>> বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) অনুমতি ছাড়াই রায়গঞ্জে চলছে ‘মিনি পেট্রোল পাম্প

>> মাত্র এক হাজার টাকার বিরোধে যুবককে হত্যা মামলার মূল আসামি শাহীন গ্রেফতার

আপনি পড়ছেন : জাতীয়

মেজর সিনহার জীবনের অন্ধকার রাত 


নিজস্ব প্রতিনিধি -ই সময়

eshomoy.com || 2022-01-31
মেজর সিনহার জীবনের অন্ধকার রাত 

 

 

 

৩ জুলাই ২০২০। অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান তিন সহযোগীসহ কক্সবাজার আসেন। কলাতলীতে ওয়াল্ড বিচ রিসোর্টে ওঠেন তারা। উদ্দেশ্য, জাস্ট গো নামের ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভ্রমণ বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে। ৭ জুলাই ২০২০। টিমটিঠিকানা বদল করে। হিমছড়ির নিলীমা রিসোর্টের ডি-১ কটেজে ওঠেন তারা। শুরু হয় কক্সবাজারের মনোরম দৃশ্য এবং বৈচিত্রপূর্ণ জীবন ও জীবিকার তথ্য সংগ্রহ আর ভিডিও চিত্র ধারণ।


এক পর্যায়ে তারা যান টেকনাফে। এ সময় তারা মাদক নির্মূল অভিযানের নামে সাধারণ মানুষের ওপর ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নিপীড়নের কথা জানতে পারেন। ভূক্তভোগী অনেক পরিবার সিনহা ও তার টিমের কাছে ওসি প্রদীপের অত্যাচার নিপীড়নের বর্ণনা দেয়। সিনহা ও তার লোকজন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ও তাদের বাহিনীর নাম নানা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এরইমধ্যে জুলাই মাসের কোন একদিন মেজর সিনহা, শিপ্রা দেবনাথ ও সাহেদুল ইসলাম রিফাতের সঙ্গে দেখা হয় ওসি প্রদীপের। তারা নানা অভিযোগ সম্পর্কে ওসি প্রদীপের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।


দলবল নিয়ে নিলীমা রিসোর্টে থেকে কাজ চালিয়ে যান। তবে, হুমকিতে কাজ না হওয়ায়, বিষয়টি বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আইসি ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীকে জানান ওসি প্রদীপ। থানার সোর্সদের সঙ্গে গোপনে কথা বলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ওসি প্রদীপ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত তিন সোর্স মো. নুরুল আমিন, আইয়াছ উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে করণীয় ঠিক করতে মিটিং করেন।


তারা তথ্য সংগ্রহে নামে। ক্রসফায়ারে নিহত ব্যক্তি ও অন্যান্য ভিক্টিম পরিবারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেজর সিনহা ও তার টিম সম্পর্কে খোঁজ নেয় সাদা পোশাকের পুলিশ ও সোর্স। বলে আসে, এ ধরণের লোকজন আসলে পুলিশকে খবর দিতে।


আইসি লিয়াকত আলী পুলিশের সোর্স নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আইয়াছের সঙ্গে আবারও মিটিং এ বসেন। সিনহা ও তার ভিডিও দলকে খুঁজে বের করতে তাড়া দেন। তা না হলে ওসি প্রদীপ লিয়াকতের বড় ধরণের ক্ষতি করবে।


৩১ জুলাই ২০২০। রামু সেনা নিবাসের জিওসি’র বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী। ৩ নম্বর সার্ভিস পয়েন্টে উপস্থিত লিয়াকত আলী ও প্রদীপ কুমার দাশ। অনুষ্ঠান শেষে সেই ভিডিও ধারণ করা দলটি সম্পর্কে লিয়াকতকে আবারও সতর্ক করেন ওসি প্রদীপ। এ বিষয়ে কোন ধরনের ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন।


ঐদিনই বিকেল সাড়ে তিনটা। প্রাইভেটকার ঢাকা মেট্রো-গ ২৮-০৯৯৭ ছুটে চলছে। ব্যক্তিগত গাড়িটি চালাচ্ছেন সিনহা নিজেই। সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাত। গন্তব্য টেকনাফ থানার মারিশ বুনিয়া মুইন্ন্যা পাহাড়ের চূড়া। উদ্দেশ্য প্রতিদিনের মতো ভিডিও করা।


নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে নতুন মেরিন ড্রাইভ রাস্তার পাশে গাড়িটি পার্কিং করে পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হন তারা। সিনহার পরনে ছিলো সেনাবাহিনীর পোষাকের মত কম্ব্যাট প্যান্ট ও কম্ব্যাট গেঞ্জি। পাহাড়ে ওঠার সময় মারিশ বুনিয়া মাথাভাঙ্গা মসজিদের ইমামের সাথে সালাম বিনিময় হয় সিনহার। একটি ছোট ছেলের কাছ থেকে তারা পাহাড়ে ওঠার পথ জেনে নেন। পাহাড় ও সমুদ্রের মেল বন্ধনে সূর্যাস্তের টাইমল্যাপস ধারণ করতে করতে অন্ধকার হয়ে যায়।


রাত আটটা। মেজর সিনহাকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলতে পাতা হয় ফাঁদ। দক্ষিণ মারিশবুনিয়া জামে মসজিদের ঘোষণা দেয়া হয় পাহাড়ে ডাকাত দেখা যাচ্ছে। এ সময় জড়ো হয় কিছু লোক। কিন্তু পাহাড়ে কোনো সাড়াশব্দ বা লাইট না দেখা যাওয়ায় তারা চলে যায়। ভেস্তে যায় ফন্দিটি। কিন্তু তাতে দমে যায়নি পুলিশের ৩ সোর্স।


কিছুক্ষণ পর পাহাড় থেকে পুলিশের ঐ তিন সোর্সের সামনে দিয়ে নেমে আসেন মেজর সিনহা ও সিফাত। এ সময় তারা, সিনহা ও সিফাতের মুখের উপর টর্চ লাইটের আলো ফেলে নিশ্চিত হয় এই সেই ভিডিও দল। নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও আইয়াজ সিনহাকে অনুসরণ করে মেরিন ড্রাইভ পর্যন্ত আসে। এবং তারা কোন দিকে যাচ্ছেন তা নিশ্চিত হন।


সোর্স নুরুল আমিনের কল পেয়ে ইন্সপেক্টর মো. লিয়াকত আলী ছোটেন শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে। তড়িঘড়ি করে সঙ্গে কোন ফোর্স না নিয়ে এসআই দুলালসহ মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছে অস্ত্রসহ অবস্থান নেন লিয়াকত। অপেক্ষা করতে থাকেন সিনহার গাড়ির আগমনের।


রাত ৯টা ২০ মিনিট। বিজিবি চেকপোস্ট অতিক্রম করে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার গাড়ি। ৫ মিনিটেই গাড়িটি পৌঁছে শামলাপুর চেকপোস্টে। এপিবিএন সদস্য কনস্টেবল রাজীব গাড়িটি থামানোর সংকেত দেন। সংকেত পেয়ে থেমে যায় সিনহার গাড়ি।


কনস্টেবল রাজীব পরিচয় জানতে চাইলে বাম পাশে বসা সাহেদুল ইসলাম রিফাত গাড়ির জানালা খুলে দেন। এ সময় গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসা অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিজের পরিচয় দেন। কুশল বিনিময় শেষে কনস্টেবল রাজীব ও অন্য দুই এপিবিএন সদস্য এসআই শাহজাহান আলী ও কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল-মামুন ইমন স্যালুট দিয়ে গাড়িটি চলে যাওয়ার সংকেত দেন।


সংকেত পেয়ে গাড়িটি এগোতেই মেজর সিনহা নাম শুনেই পেছন থেকে চিৎকার করে সামনে চলে আসেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত। আবার তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। পুণরায় তিনি নিজেকে মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা বলে পরিচয় দেন। নাম শুনে উত্তেজিত লাফ দিয়ে সামনে গিয়ে ব্যারিকেট টেনে রাস্তা বন্ধ করে দেন লিয়াকত। রাস্তা ব্লকে লিয়াকতকে সহায়তা করেন এসআই নন্দ দুলালও।


লিয়াকত আলীর চোটপাটের মধ্যে দুই হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নেমে আসেন ২য় আসনে বসা সাহেদুল ইসলাম রিফাত। ড্রাইভিং সিটে বসা সিনহা গাড়ি থেকে দুই হাত উচু করে নেমে ইংরেজিতে কামডাউন কামডাউন বলে লিয়াকত আলীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।


৯টা ২৫ এ শামলাপুর চেকপোস্টে পৌঁছে মেজর সিনহার গাড়ি। ঘটনার পর ৯টা ৩০ মিনিটে ১ মিনিট ১৯ সেকেন্ড এবং ৯টা ৪৫ মিনিটে ১৬ সেকেন্ড লিয়াকতের সঙ্গে কথোপকথন হয় ওসি প্রদীপের। ৯টা ৩৩ মিনিটে আইসি লিয়াকত আলী ঘটনাটি কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে জানান।


এদিকে, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রে ফোন করে এসআই নন্দ দুলাল শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে কিছু পুলিশ সদস্য পাঠানোর জন্য বলেন। নির্দেশ পেয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে ছুটে আসেন এসআই লিটন, কনস্টেবল আব্দুল্লাহ আল মামুন, কামাল হোসেন আজাদ ও ছাফানুল করিম। তাদেরকে সিনহার গাড়ি তল্লাশির নির্দেশ দেন লিয়াকত। তল্লাশি করে, গাড়ির ভেতরের সামনের দুই সিটের মাঝখান হতে একটি অস্ত্র পিস্তল, এবং ড্যাশ বোর্ডে কিছু কাগজপত্র, ক্যামেরা, সিডিবক্স, ও ভিডিও করার যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।


লিয়াকত আলীর সফলতার ফোন পেয়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ একটি সাদা মাইক্রোবাসে এবং তার সাথের ফোর্স একটি পিকআপ ভ্যানে চড়ে ঘটনাস্থলে আসেন। তখন রাত ১০টা। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীর সঙ্গে একান্তে আড়ালে আলাপ করেন।


তদন্ত কর্মকর্তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিনহাকে লিয়াকত গুলি করেন আনুমানিক রাত ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩০ এর মধ্যে।


হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রাত দশটার কিছু আগে কনস্টেবল কামাল ও মামুন কোরবানির গরু বহনকারী একটি ছারপোকা বা মিনি পিকআপ থামান। সিনহাকে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে গাড়িতে তোলা হয় রাত ১০টা ৪৪ মিনিটের দিকে। ছারপোকা গাড়ি ছাড়াও ওসি প্রদীপ কুমার দাশ রাত ১০টার সময় একটি মাইক্রোবাস ও একটি পিকআপ নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন।


এই সোয়া এক ঘণ্টায় সেখানে আর কী হয়েছে তাও জেনে নেয়া যাক। ওসি প্রদীপ তার সঙ্গে আসা ফোর্সকে সিনহার গাড়িটি আবারও তল্লাশি করতে বলেন। টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব ও রুবেল শর্মা যে মাইক্রোবাস দিয়ে ওসি প্রদীপ এসেছিলেন তার দিকে যান। 


কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তারা চিৎকার করে জানায় মেজর সিনহার গাড়ির ভেতর মাদক পাওয়া গেছে। যদিও আইসি লিয়াকত আলীর নির্দেশে ঘটনার পরপরই করা তল্লাশিতে কোন মাদক উদ্ধার হয়নি। এরপর সিনহার সঙ্গী সিফাতকে চেকপোস্টের ভেতর নিয়ে মুখের উপর পানি ঢেলে এবং নানাভাবে নির্যাতন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।


ঘটনার সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর সিনহাকে বহনকারী গাড়ি পৌঁছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। কতর্ব্যরত ডাক্তার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে ঘোষণা করেন ভিক্টিমকে মৃত আনা হয়েছে।