আইয়ুব খান মেড আ মিসটেক। হি শুড কিলড দ্য... মুজিব
স্টাফ রিপোর্টারঃ
eshomoy.com || 2021-01-05 18:03:30
সময়টা পাকিস্তান আমল, আইয়ুব খানের শাসন চলছে। এক বাঙালি তরুণ ক্রিকেটার স্থান পেয়েছেন পাকিস্তান অনুর্ধ্ব-২৫ দলের ক্যাম্পে। একজন বাঙালি ক্রিকেটারের জন্য পাকিস্তান দলের হয়ে খেলাটা তখন স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। পশ্চিম পাকিস্তানিদের দাপটে কালেভদ্রে কোনো বাঙালি ক্রিকেটারকে পাকিস্তানি জার্সি গায়ে দেখা যেত, সেখানে এক তরুণ আছেন হাতছোয়া দূরত্বে।
ক্যাম্পের মধ্যে সেদিন চলছিল আড্ডা। রাজনীতিও চলে এসেছে আলোচনায়। হঠাৎবাঁহাতি স্পিনার, পেশোয়ারের কামরান রশীদ বলে উঠল, '
আইয়ুব খান মেড আ মিসটেক। হি শুড কিলড দ্য... মুজিব।
একটা সেকেন্ডও দেরি হলো না। বাঙালি সে ক্রিকেটারের সপাট ঘুষিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কামরান। চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার পর শুরু হলো ভয়ঙ্কর পিটুনি। পেটাতে পেটাতে কামরানকে টিলার নিচে নিয়ে এলেন, হাতের কাছে যা পেলেন, তা-ই দিয়ে চলল আঘাত; ততক্ষণে রক্তাক্ত কামরান জীবনভিক্ষা চাইতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের বুকে, করাচিতে বসে একজন বাঙালির এই রুদ্রমূর্তি দেখে যেন বিস্ময়ে, আতঙ্কে পাথর হয়ে রইল পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা।
সে ক্রিকেটারের নাম জানেন? তিনি রকিবুল হাসান, বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক।
এরকম একটা দুঃসাহসী কাজের পর ক্যারিয়ার শঙ্কার মুখে পড়ে গিয়েছিল রকিবুলের। ডাকা হলো কোর্ট মার্শাল। মেজর সুজা জিজ্ঞেস করলেন, এরকম করার কারণটা কী।
রকিবুল দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিলেন,
ও আমার নেতাকে গালি দিয়েছে, বাঙালির নেতাকে গালি দিয়েছে। যতবার গালি দেবে, ততবার আমি এমন করব।
নিজের বাঙালিত্ব নিয়ে গর্ব করা এ মানুষটির দুঃসাহসের পরিচয় পাকিস্তানিরা পেয়েছে আরেকবার, সেটা পুরো পৃথিবীর সামনে।
সময়টা ১৯৭১ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক একাদশ বনাম পাকিস্তান একাদশের অনানুষ্ঠানিক টেস্ট ম্যাচ। দলে সুযোগ পেয়েছেন আমাদের রকিবুল। যে দলের হয়ে খেলার স্বপ্নে তিনি বিভোর ছিলেন আজীবন, সে মূহুর্ত এখন খুব কাছে। ঠিক তখন একটা বিষয় জানতে পেরে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন।
২৫ শে ফেব্রুয়ারি,ম্যাচের আগের দিন। পাকিস্তান দলের সব খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়েছে 'গ্রে নিকোলস' ব্র্যান্ডের ব্যাট; যার ওপরে আইয়ুব খানের নির্বাচনী প্রতীক তলোয়ার চিহ্ন লাগানো!
রকিবুলের মাথায় রক্ত উঠে গেল। এই সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে; বাঙালির দল জিতে গেছে নির্বাচনে। এখন বাঙালির সরকার গঠনের অপেক্ষা। এমন সময়ে ব্যাটে আইয়ুব খানের প্রতীক নিয়ে ব্যাটিং করতে নামতে হবে? নামটা যখন রকিবুল, সেটা তখন অসম্ভব।
রাতেই পূর্বাণী হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন বন্ধু শেখ কামালের কাছে(বঙ্গবন্ধুর সন্তান)। পরামর্শে বসলেন—কী করা যায়? শেখ কামাল বুদ্ধি দিলেন,
তলোয়ারের বদলে তোর গান অ্যান্ড মুরের ব্যাটে জয় বাংলা লেখা স্টিকার লাগিয়ে খেলতে নাম!
যেমন ভাবা, তেমন কাজ। স্টিকার জোগাড় হলো। যারা ভেতরের ঘটনা জানত, উত্তেজনায় সবাই ছটফট করছে। ছেলেটি নির্বিকার। অবশেষে এল সেই ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল। পাকিস্তানি আজমত রানাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাটিং শুরু করতে নামল ছেলেটি। একজন ফটোগ্রাফার প্রথম খেয়াল করলেন ব্যাপারটা। ছুটে এলেন ছবি তুলতে। মুহূর্তে স্টেডিয়াম জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ল—'জয় বাংলা' স্টিকার নিয়ে পাকিস্তানের হয়ে খেলছে একটি বাঙালি ছেলে। স্টেডিয়াম জুড়ে উঠল স্লোগান—জ য় বা ং লা!
ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরা মুহুর্তে মুহুর্তে বন্দি করছে রকিবুলের ব্যাটে লেখা জয় বাংলাকে। বাংলাদেশের ‘ইত্তেফাক’ থেকে শুরু করে ‘লন্ডন টাইমস’, সকল খ্যাতনামা পত্রিকায় ছাপা হলো খবর: এক বাঙালি ক্রিকেটারের বীরত্বগাথা।
কোনো প্রতিবাদ শাসকেরা সহজে ছাড়ে না। সেই 'জয় বাংলা' স্টিকারের ফল হিসেবে জীবনটাই দিতে হচ্ছিল রকিবুল হাসানকে। ম্যাচ চলা অবস্থাতেই সংসদ ভেঙে গেল, আগুন জ্বলে উঠল শহরে, খবর পৌঁছাতে স্টেডিয়ামের প্যান্ডেলেও লাগল আগুন। পুরো নগরীই তখন জ্বলছে, ক্রিকেট কি আর বাঁচে। বাকি পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা তখন ক্যান্টমেন্টে আত্মগোপন করল। আর রকিবুল মিশে গেলেন ছাত্র-জনতার মিছিলে। তখনও তিনি জানেন না, তাঁর নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়ে গেছে, দেখা মাত্র গ্রেফতার!
পলায়নপর অবস্থায় থাকতে থাকতে চলে এল ৭ মার্চ; জাতি পেয়ে গেল মুক্তির দিশা। রকিবুল বুঝে গেলেন, যুদ্ধেই যেতে হবে। ২৫ মার্চ ঢাকায় নামল পাকিস্তানি বাহিনী; রকিবুল জানলেন, তাঁকে খোঁজা হচ্ছে মেরে ফেলার জন্য। পরিবার চলে গেল গোপালগঞ্জে নিজেদের বাড়িতে; আর রকিবুল হাসানরা দুই ভাই বাবার সার্ভিস রিভলবার হাতিয়ে নিয়ে চললেন ট্রেনিং ক্যাম্পে। ছুটে চললেন সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের গন্তব্যে, যে স্বপ্নের কথা বলেছিলেন জহির আব্বাসকে।
সেই ম্যাচ ইতোমধ্যে পণ্ড। জহির আব্বাসরা ফিরে যাচ্ছেন পাকিস্তানে। যাওয়ার সময় জহির হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'রকিবুল, করাচিতেই দেখা হবে আবার।'
রকিবুল তখন দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন,
অবশ্যই। তবে আমার সঙ্গে তখন নতুন পাসপোর্ট থাকবে।
দৃঢ়চেতা সেই রকিবুল হাসানের জন্মদিন ছিল গতকাল, ১লা জানুয়ারি। জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল শ্রদ্ধা। যে দেশপ্রেমের নিদর্শন তিনি রেখে গিয়েছিলেন আমাদের সামনে, সে দেশপ্রেম যেন আমরা বুকে অটুট রাখতে পারি আজন্ম; এটাই রইল প্রত্যাশা।