শের আফগান তখন সদ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন। তিনি পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, "সেদিন কেউই আমাদের চাচার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়নি। তাকে সরাসরি লাহোর ক্যান্টনমেন্টের কর্পস হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।"
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেনারেল নিয়াজী তার নিজ জন্মস্থান মিয়ানওয়ালীতে ফিরে যান। সেখানকার নিয়াজী গোত্রের লোকজন তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। শের আফগান পরে বলেন, "আমি সেদিন উপস্থিত ছিলাম না, কারণ তখন আমি কাকুলের পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণে ছিলাম। তবে পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি, মিয়ানওয়ালীর স্থানীয় জনগণ তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল।"
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল নিয়াজীকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার শের আফগান জানান, "আমার বাবা তখন লাহোরে একটি ডিভিশনের কমান্ডার ছিলেন। একদিন জেনারেল নিয়াজীর স্টাফ অফিসার ফোন করে আমাদের জানালেন যে নিয়াজী সাহেব পূর্ব পাকিস্তানে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে আমাদের শেষ সাক্ষাৎ সেই দিনই হয়েছিল। তিনি আমাদের দোয়া চেয়ে বিদায় নেন।"
সেনাবাহিনীর ইতিহাসবিদরা বলছেন, সে সময় অনেক জেনারেলই পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল নিয়াজী তা গ্রহণ করেন। ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকী তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, "যখন অনেক জেনারেলই পূর্ব পাকিস্তানে যেতে চাননি, তখন জেনারেল নিয়াজী সাহসিকতার সঙ্গে সে দায়িত্ব নেন।"
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর তিনি ভারতীয়দের বন্দিদশায় চার বছর কাটান। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেলেও তিনি আর কখনও সেনাবাহিনীতে ফিরতে পারেননি। নিজের শহর মিয়ানওয়ালীতে অবসর জীবন যাপন করতে থাকেন।
তার এই আত্মসমর্পণ নিয়ে পাকিস্তানে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তার নাম একটি বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে থেকে যায়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে "শহিদরা মরতে জানে, গাজীরা লড়তে জানে, আর যারা পালিয়ে যায় তারা নিয়াজী"—এমন একটি ব্যঙ্গোক্তি প্রচলিত হয়, যদিও শের আফগান দাবি করেন, "এটি ভারতীয় প্রচারণার ফলাফল। সেনাবাহিনীতে এমন কিছু প্রচলিত ছিল না।"
আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানে ফিরে আসার পর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়। ১৯৮২ সালে হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্ব পালনের সময় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাকে নৈতিক স্খলনের জন্য দায়ী করা হয়। তবে নিজ আত্মজীবনী "The Betrayal of East Pakistan" বইতে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, লাহোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার দাফন হয় লাহোর সামরিক কবরস্থানে। পাকিস্তানের ইতিহাসে তিনি একজন বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। যদিও তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা তাকে দেশপ্রেমিক ও সাহসী সৈনিক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। তার আত্মজীবনী ও সামরিক ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে আজও আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।