ফ্যাকাশে চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখে মুখে হতাশা। আছে অপ্রাপ্তির চাপও। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ৯টার ঘরে। তখনো হাতে ব্যাগ ভর্তি মামলার নথিপত্র। দীর্ঘ ৫ বছর ধরে এভাবে ঘুরছেন নানা মিডিয়া অফিসে। বাদ যায়নি ডিসি কিংবা এসপি অফিস। গেছেন স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়েও। হেঁটে বিলি করছেন কাগজপত্র। কথাও বলছেন বেশি। হয়তো অতি শোকে! বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করছেন দেশের শাসন ব্যবস্থাকে! শেষ বয়সেও হেরে যেতে রাজি নয় বলে করে যাচ্ছেন যুদ্ধ। বলছি একমাত্র ছেলের ওপর ছোড়া এসিড় সন্ত্রাসের বিচার চেয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়ানো এক বাবার কথা।
বাবুল চন্দ্র দে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কারখানার কর্মকর্তা। এখন অবসরে। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কেলি শহরে। ৫ বছর আগে চড়ের প্রতিশোধ নিতে ছেলে তমাল চন্দ্র দে কে এসিডে নিক্ষেপে মুখ ঝলসে দিয়েছিল প্রেমিকা মৌমিতা। এর পর থেকে নানা হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে তখন থেকেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এ বাবা। চেয়ে যাচ্ছেন সুষ্ঠু বিচার।
ঘটনাটি ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলের। বাবুল চন্দ্র দের ছেলে তমাল চন্দ্র দে। তমাল আর মৌমিতার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। একদিন খবর আসে মৌমিতা সুমিত নামের আরেকজনের প্রেমে পড়েছে। ঘটনা জানতে মৌমিতার মুখোমুখি তমাল। মৌমিতার সাফ জবাব। সুমিতের সাথে শুধু প্রেম নয়। তাকে অনেক আগে কোর্টে গিয়ে বিয়েও করেছে সে। আকাশ ভেঙে পড়ে তমালের মাথায়। রাগে-ক্ষোভে কষে চড় মৌমিতার গালে। মৌমিতাও কম যায় না। সে চড়ের প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পনা করে। শুধু মৌমিতা নয় স্বামী-স্ত্রী দুজনই। আর প্রতিশোধে নিয়েছে এসিডে। পরে ২০১৭ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি নগরীর কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় ডেকে এসিড নিক্ষেপ করে তমালের শরীরে। জ্বলসে যায় তমালের চেহারা, চিরতরে নিভে যায় একটি চোখের আলো। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি চোখ।
এ কাহিনি যেন হার মানায় বাংলা সিনেমাকেও। যার ‘নায়িকা’ মৌমিতা দত্ত অ্যানি। ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তমাল চন্দ্র দের বাবা বাবুল চন্দ্র দে বাদী হয়ে মৌমিতা ও তার স্বামী সুমিত এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন আসামি করে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩০ মার্চ স্বামী সুমিত দত্তসহ মৌমিতা এ্যানিকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আনা হয় চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে। শুরু হয় বিচার।
অভিযুক্ত মৌমিতা দত্ত অ্যানি ও তার স্বামী সুমিত দত্ত উভয়ই নগরীর বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। স্নাতক পাস তমালের দূর সম্পর্কের আত্মীয় মৌমিতা। ২০১৫ সালে এক বিয়েতে পরিচয় পরে সম্পর্ক গড়ে উঠে তমাল-মৌমিতার। এক বছর পর তমাল জানতে পারে, মৌমিতা সুমিতের সঙ্গে ৫ বছর ধরে প্রেম করে আসছে।
এর পর থেকে যুদ্ধে নামে বাবা। তমালের মা অর্চনা রাণী দে ও বোন চান সুষ্ঠু বিচার। ঘটনার পর ৫ বছর ধরে সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে এই অফিস সেই অফিস ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাবুল চন্দ্র দে। বিলি করছেন মামলার নথিপত্র। তার দাবি প্রতিপক্ষ লাখ লাখ টাকা খরচ করছে আসামিদের খালাসের চেষ্টায়। বিচার ভিন্নখাতে নিতে চাচ্ছেন। তাকেও দিচ্ছেন নানা ধরনের হুমকি।
জেদি কণ্ঠে বাবা জানান, বেঁচে থাকতে তিনি তা হতে দেবেন না। একমাত্র ছেলের ওপর যে অন্যায় করা হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচার দেখে যেতে চান। এ ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মামলার রায় হবে। সেই রায় দেখে মরতে চান বাবুল চন্দ্র দে।