সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ফার্মেসির ভেতরে প্রবাসীর স্ত্রী শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্নার (৩৪) ছয় টুকরা লাশের রহস্য উন্মোচন করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। এ ঘটনায় জড়িত মূল হোতাসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।
সিআইডি জানায়, জ্যোৎস্না কিছুদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সমস্যার কথা স্থানীয় ফার্মেসি মালিক জিতেশ চন্দ্র গোপকে জানালে তিনি তাকে ফার্মেসিতে যেতে বলেন। এরপর ফার্মেসিতে গেলে পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হন জ্যোৎস্না। ধর্ষণের কথা সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে জিতেশসহ তিনজন জ্যোৎস্নাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ফল কাটার ছুরি দিয়ে মরদেহ ছয় টুকরা করে।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো: জিতেশ চন্দ্র গোপ (৩০), অনজিৎ চন্দ্র গোপ (৩৮) ও অসীত চন্দ্র গোপ (৩৬)।
শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সিআইডির সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির এলআইসি শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তা ধর এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর পয়েন্টের ব্যারিস্টার মির্জা আব্দুল মতিন মার্কেটের অভি মেডিকেল হল নামের একটি ওষুধের দোকান থেকে শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্নার ছয় টুকরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত জ্যোৎস্না জগন্নাথপুর থানার নারকেলতলা গ্রামের সৌদিপ্রবাসী ছরকু মিয়ার স্ত্রী। এ ঘটনায় নিহতের ভাই হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মুক্তা ধর বলেন, ওষুধ কেনার সুবাদে অভি মেডিকেল হলের মালিক জিতেশের সঙ্গে শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্নার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। জ্যোৎস্না কিছুদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জিতেশ জ্যোৎস্নার মায়ের প্রেশার মাপার জন্য তাদের বাড়িতে যায়। তখন জ্যোৎস্না তার সমস্যার কথা জিতেশকে জানালে সে তাকে ফার্মেসিতে যেতে বলে।
ঐদিন বিকেলে জ্যোৎস্না জিতেশের দোকানে গেলে কাস্টমার রয়েছে বলে তাকে অপেক্ষা করতে বলে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এদিকে রাত গভীর হলে জ্যোৎস্নার বাসায় যাওয়ার অস্থিরতা বেড়ে যায়। তখন ঐ ফার্মেসির মধ্যে জ্যোৎস্নাকে একটি ঘুমের ওষুধ খেতে দেয় জিতেশ। এতে তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তখন জিতেশ তার দুই সহযোগী অনজিৎ চন্দ্র গোপ ও অসীত গোপকে নিয়ে ধর্ষণের পরিকল্পনা করে। এরপর রাত গভীর হলে আশপাশের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তখন জিতেশ ও তার দুই সহযোগী জ্যোৎস্নাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণের বিষয়টি জ্যোৎস্না তার পরিবারকে জানাবে বলে জানান। তখন জিতেশ ও তার সহযোগীরা জ্যোৎস্নার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মুখে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
মুক্তা ধর বলেন, পরে ঐ ফার্মেসিতে থাকা ফল কাটার ছুরি দিয়ে জ্যোৎস্নার দুই হাত, দুই পা ও বুক-পেটসহ ছয় টুকরা করে। এরপর দোকানে থাকা ওষুধের কার্টন দিয়ে খণ্ডিত অংশগুলো ঢেকে রেখে তারা ফার্মেসি তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ঐ মরদেহের খণ্ডিত অংশ পাশের একটি মাছের খামারে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় ও লোকজন চলে আসায় তারা কাজটি করতে পারেনি। এ ঘটনার পর সিআইডির একাধিক দল আসামিদের গ্রেফতারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানার নুরেরচালা এলাকায় অভিযান চালিয়ে জিতেশকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জগন্নাথপুর থানার পৌর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনজিৎ ও অসীত গোপকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার জিতেশ চন্দ্র গোপ কিশোরগঞ্জ জেলার ইতনা থানার শহিলা গ্রামের যাদব চন্দ্র গোপের ছেলে, অনজিৎ চন্দ্র গোপ একই এলাকার রসময় চন্দ্র গোপের ছেলে এবং অসীত চন্দ্র গোপ নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ থানার সুয়াইর অলিপুর গ্রামের পতিত পবন গোপের ছেলে।
নিহত জ্যোৎস্না ২০১৩ সাল থেকে পৌর শহরের নিজের বাসায় দুই ছেলে, এক মেয়ে, বৃদ্ধা মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। তার স্বামী সৌদিপ্রবাসী।