মানষিকতা বলতে কারও চিন্তা করার ধরণ, তার বিচার-বিবেচনা, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ইত্যাদি মিলে মনের ভেতরের যে অবস্থাটা তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পরিচালিত করে, সেটাকেই বলা যাতে পারে তার মানসিকতা।
মানুষ মূলত তার নিজের মানষিকতা দিয়েই পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই প্রতিটি মানুষের কাথাবার্তা, কাজকর্ম ইত্যাদিতেই তার মানষিকতা প্রকাশ পায়।একজন মানুষ, কি বলছে, কিভাবে বলছে, কি করছে, কিভাবে করছে এইসব বললেই তার মানসিকতার পরিচয়। তাছাড়াও, সে অন্যের কাজকে কিভাবে গ্রহণ করছে, অন্যের কথাগুলোকে কিভাবে গ্রহণ করছে, তার কথা ও কাজের মধ্যে মিল আছে কিনা, সেইগুলো ও তার মানসিকতার পরিচয়। মানুষ কথা বলার সময় সত্য বলছে নাকি মিথ্যা বলছে, কথাবার্তা নম্রভাবে বলছে নাকি রূঢ় ভাবে বলছে, সেগুলো তার মানসিকতা। উন্নত মানসিকতার একজন লোক কখনোই মিথ্যা কথা বলবে না, অন্যকে কষ্ট দিয়ে কথা বলবে না, এমন কোন কাজ করবে না যা অন্যের ক্ষতি হয়।
ঠিক তেমনি ভাবে, একটি মানুষ ভুল করলে অন্য মানুষটি সে ভুলটিকে কিভাবে গ্রহণ করছে, বা যে ভুল করেছে সেও কাছ থেকে কিভাবে গ্রহণ করছে, সেটাও তার মানসিকতার পরিচয়। মানুষের কাজকর্মে ভুল হতে পারে।মানুষের জীবনে ভুল থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।
বিজ্ঞানি টমাস আলভা এডিশনের একটি সাক্ষাৎকার চলছিল৷ সেই সাক্ষাৎকারে এডিশন এ প্রশ্নকর্তা কথোপকথন উল্লেখ করা হলো :
প্রশ্ন কর্তা : আপনি কি কখনো ভুল করেছেন?
টমাস আলভা এডিসন : অসংখ্যবার।
প্রশ্ন কর্তা : তাহলে কি আপনার মাথায় বুদ্ধি কম?
টমাস আলভা এডিসন : বুদ্ধি অনেক কম ছিল। কিন্তু অসংখ্য বার ভুল করার কারণে বুদ্ধি বেড়ে অসংখ্য গুণ হয়ে গেছে। আমি আমার ভুলগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি।
এখানে, টমাস আলভা এডিসন উনার উন্নত মানসিকতার কারণে, বারবার ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পৃথিবীর জন্য বৃহৎ বৃহৎ আবিস্কার রেখে গেছেন।
যার মানষিকতা যত উন্নত, সে মানুষ ততই উন্নত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উনার সৃষ্টির মধ্যে শুধু মানুষকেই মানষিকতা দান করেছেন। মানুষের আশরাফুল মাখলুকাত হওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে মানুষের মানসিকতা আছে, সৃষ্টির অন্যান্য জীবের মধ্যে এই মানসিকতা বিষয়টি নেই।
মানুষ হওয়া সত্বেও যদি কারো মধ্যে মানসিকতার ঘাটতি থাকে, তবে সে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও পশুর সমান। মানুষকে মানুষ হিসেবে দাবী করতে হলে আগে মানসিকতা উন্নত করা উচিত।
একজন মানুষের মানসিকতা তার জন্য থেকে শুরু করে, বেড়ে ওঠার ধরন, আশেপাশে মানুষের আচার ব্যবহার, পরিবেশ, শিক্ষাদিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, পরিবারের মানুষের আচরণ সহ বিভিন্নভাবে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। তবে এখান থেকে পরিপূর্ণ মানসিকতা তৈরি হয় না। একটি পরিপূর্ণ মানসিকতা তৈরীর জন্য একটি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মানুষ কিভাবে নিজেকে গড়ে তোলে, নিজের মানসিকতাকে গ্রহণ করতে চায়,সেটার উপর মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা থাকে। মানুষের মানষিকতা যেমন ভাবেই তৈরি হওক না কেন, সে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে৷
যখন একজন মানুষের মানষিকতা অন্যজনের মানষিকতার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, সেটাই সুস্থ মানষিকতা। যদি একজনের মানষিকতা অন্যজনের মানষিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তার মানষিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তাদের মধ্যে মনমালিন্য সৃষ্টি হয়। যার ফলে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বন্ধু-বান্ধব দের এই সমস্যাটা বেশি সৃষ্টি হয়। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সমস্যা হতে পারে। আবার স্বামী স্ত্রীর মাঝে মানষিক মিল না থাকলে আস্তে আস্তে একটা সময় তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সংকীর্ণ মানষিকতা একটি দূর্বল মানবিকতার উদাহরণ, যা মানুষের মধ্যে থাকলে সে জনজীবনে নানা রকম সমস্যায় পড়বে। সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে মানুষ সত্যের দিশা থেকে বঞ্চিত হয়।
পবিত্র কুরআন শরীফে সুরা আনআম এর ১২৫ নাম্বার আয়াতে বর্ণিত আছে,
আল্লাহ কাউকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাইলে তিনি তার অন্তরকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন এবং কাউকে বিপথগামী করতে চাইলে তিনি তার অন্তরকে অতিশয় সংকীর্ণ করে দেন। ফলে তার কাছে ইসলাম অনুসরণ আকাশে আরোহণের মতোই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।যারা বিশ্বাস করে না আল্লাহ তাদের এভাবে লাঞ্ছিত করেন।’
মানষিকতা কেমন হওয়া দরকার, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হযরত মুহাম্মদ (স.)। রাসুলুল্লাহ সাঃ এর মানষিকতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানষিকতা। তিনি কখনো অন্যের মানষিকতাকে বাধা দেন নি। নবী করিম সাঃ এর কাছ থেকে উন্নত মানষিকতার শিক্ষা নিয়েছিলেন উনার সাহাবীগণ। তাই উন্নত মানষিকতা শিক্ষা নিতে হলে আমাদেরকে হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর সাহাবিদের অনুসরণ করতে হবে। হাদিস শরীফে যে রকম মানষিকতার কথা বলা আছে, সেইভাবেই আমাদের মানষিকতা তৈরি করতে হবে।
মানুষকে মানষ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তার মানসিকতা। প্রত্যেকটা মানুষের মানসিকতা উন্নত করা উচিত। যদি আমাদের মানসিকত উন্নত থাকে, তবে ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন থেকে শুরু করে জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা সর্বস্থানে মূল্যায়ন পাব। অপরদিকে, আমরা যদি সংকীর্ণ মানসিকতার অধিকারী হই, তাহলে সর্বক্ষেত্রে আমাদেরকে লাঞ্ছনা, ঘৃণা নিয়ে জীবন যাপন করতে হবে। তাই, আমাদের সকলকে নিজেদের মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। উন্নত মানসিকতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার মধ্যে পার্থক্য বুঝা উচিত। কিভাবে উন্নত মানসিকতার সৃষ্টি করা যায়, তা প্রত্যেকটি মানুষেরই জানতে হবে। তাহলেই, আমরা উন্নত মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারব।