ইদানিং ভারত ও পাকিস্তান একে অপরকে পারমাণবিক বোমা হামলার হুমকি প্রদান করছে। কোনো কারণে যদি এই দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ আরম্ভ হয় তাহলে চীনও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আমরা বরং ইন্দো-চীন পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে একটু আলোচনা করি।
ভারত ও চীনের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বা পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে এর ফলাফল হবে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। এতে শুধু এই দুই দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। যেমন:
১.তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয়:
বিশ্ব ব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্যমতে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ৮১৪ কোটির অধিক। ভারতের জনসংখ্যা ১৪৫ কোটি এবং চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২৫ কোটি এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটির অধিক। তাছাড়া নেপাল, আফগানিস্তান, মায়ানমার এসব দেশের জনসংখ্যাও কম নয়। কোনো কারণে ইন্দো-চীন পারমাণবিক যুদ্ধ হলে সমগ্র এশিয়ায় প্রায় ৩৫০ কোটির অধিক মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে যা তাবৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের চেয়েও ঢের বেশি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে (যেমন: দিল্লি, মুম্বাই, বেইজিং, সাংহাই) কয়েক কোটি মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটবে। বিস্ফোরণের তাপ ও ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ শহরগুলোকে সম্পূর্ণ বিলীন করে ফেলবে। দগ্ধ হওয়া, অঙ্গহানি, অন্ধত্ব ও বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে মৃত্যু হবে বিস্ফোরণস্থলের বাইরের এলাকাগুলোতেও।
২.তেজস্ক্রিয়তা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি:
বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় বিকিরণ কয়েক হাজার বর্গকিমি এলাকায় প্রভাব ফেলবে। ক্যানসার, বংশগত ত্রুটি, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, জন্মগত সমস্যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করবে। পরবর্তী ১০–২০ বছর ধরে সমাজে উচ্চ মৃত্যুহার ও পঙ্গু মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
৩.পরিবেশগত বিপর্যয়:
বিস্ফোরণের কারণে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া ও ধুলো বায়ুমণ্ডলে উঠে গিয়ে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত করবে।
পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একে “পারমাণবিক শীত” (Nuclear Winter) হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ফলে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে, দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, এমনকি যুদ্ধ-অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ছাড়াও অন্যান্য দেশে খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ শুরু হবে।
৪.অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত ক্ষতি:
অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ব্যাংকিং, ব্যবসা, উৎপাদন, বিদ্যুৎ,পানি সরবরাহের ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়বে। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে পরিগণিত চীন ও ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হলে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দেবে। প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, পণ্য সরবরাহ শৃংখল থেমে যাবে, যা তাবৎ বিশ্ব অচল করে দেবে।
৫. ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা:
চীন বা ভারত আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য শক্তিধর দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হবে। ফলে পৃথিবীর অনেক অঞ্চল অনিরাপদ হয়ে উঠবে।
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাসহ অন্যান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়বে।
৬.মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সংকট:
যদি পারমাণবিক অস্ত্রের মাত্রা বিস্তৃত হয় (যেমন: কয়েকশ বা হাজারখানেক বোমা ব্যবহার হয়), তাহলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও পানি সংকট দেখা দেবে। জাতীয় সীমানা ভেঙে পড়বে, বিশৃঙ্খলা, দেশত্যাগ ও দাঙ্গা শুরু হবে।
মানবসভ্যতার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে (বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধ হলে মানব সভ্যতা বিলুপ্ত হতে পারে, যদিও প্রজাতি হিসেবে মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে)।
মোটকথা, ইন্দো-চীন পারমাণবিক যুদ্ধ কেবল এই দুই দেশের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির জন্য একটি মহা বিপর্যয় হতে পারে। এমন যুদ্ধে ধ্বংস ও বিলুপ্তি ছাড়া কিছুই অর্জনের সুযোগ নেই।