ওয়ান-ইলেভেনের তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তখন চরম অন্ধকার ও ভীতিকর। আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজবন্দী, আর তারেক রহমান গ্রেপ্তার। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাই কারাগারে। আমার রাজনৈতিক অভিভাবক, জননেতা ফজলুল হক মিলন ভাইও গ্রেপ্তার হন। মুহূর্তের মধ্যে গাজীপুর জেলা বিএনপি অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে।
আমি তখন গাজীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। চারিদিকে ধরপাকড়, পুলিশের ভয় আর চতুর্দিকে শুধু অন্ধকার। ঠিক সেই কঠিন সময়ে বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে একমাত্র ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ্ স্যার সাহসী বীরের মতো দলের হাল ধরেন।
কিন্তু কোথাও কোনো কর্মসূচির সুযোগ ছিল না। বিএনপির পার্টি অফিসে তালা ঝুলছিল, গাজীপুরের কোথাও কোনোভাবেই সমাবেশ বা সভা করার পরিবেশ ছিল না। ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ যেখানেই যেতেন, পুলিশ, র্যাব ও যৌথবাহিনী ঘেরাও করে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করত।
হঠাৎ একদিন আমার ফোনে একটি কল এলো। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো পরিচিত কণ্ঠ—
"দেখো, আমি ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ বলছি।"
আমি সালাম জানিয়ে বললাম, "স্যার, আসসালামু আলাইকুম।"
তিনি বললেন, "আমি তোমার বাসায় একটি টেলিকনফারেন্স করব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে এটি করতেই হবে।"
তার কিছুক্ষণ পর গাজীপুর জেলা বিএনপির তৎকালীন নেতা মরহুম অ্যাডভোকেট মনজুর মোর্শেদ প্রিন্স ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, "হান্নান শাহ্ স্যার তোমার বাসায় টেলিকনফারেন্স করবেন।"
আমি কিছুটা শঙ্কিত হয়ে বললাম, "পিন্স ভাই, আমিও তো গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারি! এখন কী করব?"
পিন্স ভাই পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "আমাকে ফোন করেছিলেন, তোমাকেও ফোন করেছেন। কাল সকাল ১০টায় প্রোগ্রাম, মিডিয়া থাকবে। 'এনি হাও' এই প্রোগ্রাম আমাদের করতেই হবে।"
আমি আর দ্বিতীয়বার ভাবিনি, ঝুঁকিপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম। আমার বড় ভাই—বিএনপি নেতা ও সাবেক পূবাইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কে এম সোলেইমান খান কে বিষয়টি জানালাম। বড় ভাই বললেন, "সেলিম খানের সাথে কথা বলো।" আমার আরেক ভাই সেলিম ভাই সব শুনে বললেন, "ঠিক আছে, ওকে।"
পরের দিন সকাল হতেই টানটান উত্তেজনা। কথা মতোই ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ্ স্যার চলে আসলেন আমাদের বাড়িতে (৪০ নং ওয়ার্ড, কুদাব খান বাড়ি)। সঙ্গে দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
শুরু হলো ঐতিহাসিক সেই টেলিকনফারেন্স। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, দেশনায়ক তারেক রহমানসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে অত্যন্ত সফলভাবে প্রোগ্রামটি শেষ হলো। প্রোগ্রাম শেষে স্যার দুপুরে নেতাকর্মীদের নিয়ে আমাদের বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া করলেন এবং বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলেন।
তখন আমি সদ্য বিবাহিত, ঘরে নতুন বউ। সেই রাতেই ঘনিয়ে এলো মারাত্মক বিপদ। আনুমানিক রাত ১২টার দিকে র্যাব ও ডিবি পুলিশ পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলল। আমাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর একটানা ৮ থেকে ৯ দিন আমার কোনো খোঁজ ছিল না, পরিবার জানত না আমি কোথায় আছি।
অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর ৯ দিন পর আমাকে কোর্টে তোলা হলো। দেওয়া হলো রিমান্ড। জেল-জুলুম সহ্য করে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে দুই মাস পর কারামুক্ত হই। জীবনের সেই ভয়াবহ ও নৃশংস স্মৃতির কথা আজও ভোলা যায় না।
আজ ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ্ স্যারের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে বড্ড বেশি মনে পড়ছে। রাজনীতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছি, জীবন বাজি রেখে ঝুঁকি নিয়েছি, আন্দোলন-সংগ্রামের ময়দানে কখনো পিছিয়ে যাইনি। আজ হান্নান শাহ্ স্যার বেঁচে থাকলে হয়তো সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করতেন, আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন সেই সাহসী পদক্ষেপের কথা।
ওপারে ভালো থাকবেন আমাদের প্রিয় অভিভাবক ও রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক। মহান আল্লাহ তাআলা আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমীন।
লেখক : এড নজরুল ইসলাম খান বিকি
সাবেক সাধারণ সম্পাদক বৃহত্তর গাজীপুর জেলা সেচ্ছাসেবক দল, সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য সেচ্ছাসেবক দল, সাবেক কাউন্সিলর ৪০ নং ওয়ার্ড গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ও সাবেক সদস্য সচিব পূবাইল থানা বিএনপি, আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।