সব সময় সব খানে


রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

৮ ভাদ্র ১৪৩৩

সব সময় সব খানে!
রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
**সদ্যপ্রাপ্ত

>> নকীবদের শপথ গ্রহণ; ফরিদপুরের মুফতি আবু নাসির আইয়ুবীর সাফল্য অর্জন

>> গণভোটের রায় বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: জামায়াতের অবস্থানে কি দ্বিচারিতা?

>> ফুলবাড়ীতে সীমান্তের ১৫ যুবককে ইলেকট্রিক্যাল প্রশিক্ষণ দিল বিজিবি

>> সানন্দবাড়ীতে ৭ কেজি গাঁজাসহ নারী আটক

>> হাতীবান্ধায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

>> মীরসরাইয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার: বিশেষ সম্মাননা পেলেন ওসি ফরিদা ইয়াসমিন

>> শীত আসার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপে মুগ্ধ পর্যটকরা।

>> ফুলবাড়ীতে বিজিবির অভিযানে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকার মাদক জব্দ

>> হাতীবান্ধায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

>> ফরিদপুরে ওই যে বর্তমান যুগের লেটেস্ট শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে স্কুলড্রেস, ব্যাগ, জুতা বিতরণ করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

আপনি পড়ছেন : সম্পাদকীয়

অনলাইনে একশো, বাস্তবের মাঠে কত?

বিএনপি–জামায়াতের রাজনৈতিক সমীকরণের উল্টে যাওয়া হিসাব


সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

eshomoy.com || 2026-08-14 20:10
 বিএনপি–জামায়াতের রাজনৈতিক সমীকরণের উল্টে যাওয়া হিসাব
২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদপ্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল অলি আহমেদ

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব-নিকাশ এক মুহূর্তে যেন উল্টে গেল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটল ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতির পুরোনো অনেক হিসাব নতুন করে লেখা শুরু হলো।


তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট—নির্বাচনী মাঠে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই এই দুই রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হয়।


কিন্তু নির্বাচনের আগে যে রাজনৈতিক সমীকরণটি তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে গেল।


অনলাইনের হিসাব বনাম মাঠের হিসাব


বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নতুন নয়। দলটি কখনো এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারেনি। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোট করে সরকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে; আবার বিভিন্ন নির্বাচনে সীমিত সংখ্যক আসন নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে।


কিন্তু ২০২৪-এর পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক মাঠের পুনর্বিন্যাস জামায়াতের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করে। বিএনপির পর দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে দলটি।


এখান থেকেই শুরু হয় নতুন সমীকরণ।


নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিভিন্ন জরিপ, পোল, শেয়ার, ভিডিও এবং ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে এমন একটি আবহ তৈরি হতে থাকে—যেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনের পর ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।


অনলাইন রাজনৈতিক আলোচনায় তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অনেক সময় মনে হয়েছে, ভার্চুয়াল জগতের রাজনৈতিক পাল্লা যেন একদিকে অনেকটাই ভারী।


কিন্তু প্রশ্ন ছিল—


অনলাইনের সেই জনপ্রিয়তা কি ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাবে?


নির্বাচনের ফল: সমীকরণের প্রথম বড় ধাক্কা


১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর ব্যালটের হিসাব সামনে আসতেই অনলাইন আলোচনার অনেক পূর্বানুমান বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি।


বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পায় এবং তাদের মিত্রদের নিয়ে জোটের আসন দাঁড়ায় ২১২টি। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসন পায় এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়।


অর্থাৎ—


অনলাইনের দৃশ্যপট ≠ নির্বাচনের ফলাফল।


এখানেই রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


তবে এই ফলাফলকে জামায়াতের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা জনসমর্থনহীনতার প্রমাণ হিসেবেও দেখা যাবে না। বরং ভোটের হিসাবে জামায়াত ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে—যা তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়।


অর্থাৎ আসল সমীকরণ আরও সূক্ষ্ম।


জামায়াতের ভোট আছে—কিন্তু সেই ভোটকে অনলাইন উপস্থিতির তুলনায় যতটা বড় মনে হচ্ছিল, আসন সংখ্যায় তার প্রতিফলন ততটা হয়নি।


আসল শক্তি কোথায়—ফেসবুকে, নাকি ভোটকেন্দ্রে?


নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক সক্রিয়তা অনেক সময় বাস্তব জনসমর্থনের চেয়ে বড় একটি ছবি তৈরি করতে পারে।


একটি পোস্ট কয়েক লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।


একটি অনলাইন পোল হাজার হাজার মানুষ অংশ নিতে পারে।


একটি ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হতে পারে।


কিন্তু একটি ভোটকেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত একজন ভোটার একটি ভোটই দেন।


এখানেই পার্থক্য—


ভিউ দিয়ে সরকার গঠন হয় না।


শেয়ার দিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসে না।


অনলাইন পোল দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় না।


রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় সাংবিধানিক ও নির্বাচনী কাঠামোর মধ্য দিয়ে।


বিএনপির ২০৯, জামায়াতের ৬৮—এর রাজনৈতিক অর্থ কী?


এই ফলাফল বিএনপিকে দিয়েছে একটি শক্তিশালী সংসদীয় অবস্থান। অন্যদিকে জামায়াতকে দিয়েছে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।


অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফলকে কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব দিয়ে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না।


বরং বলা যায়—


বিএনপি পেয়েছে ক্ষমতার ম্যান্ডেট, জামায়াত পেয়েছে শক্তিশালী বিরোধী অবস্থান।


এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।


কিন্তু নির্বাচনের আগে অনলাইন রাজনৈতিক আলোচনায় যে ধারণা তৈরি হয়েছিল—জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট হয়তো সরকার গঠনের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে—বাস্তব ভোটের ফলাফল সেই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করেনি।


এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: আরেকটি নতুন সমীকরণ


জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।


রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ পদত্যাগ করার পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন, যতক্ষণ না নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।


ফলে এখানে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে আসে—


অনলাইন জনপ্রিয়তা, নাকি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা—কোনটি শেষ কথা?


উত্তরটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে।


সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত শক্তিশালী। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদীয় সংখ্যা সেই সমীকরণে তাদের প্রভাব রাখলেও এককভাবে ফল নির্ধারণ করার মতো অবস্থানে নেই।


ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে অনলাইনে যতই উত্তাপ তৈরি হোক, যতই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, পোল, প্রচারণা কিংবা সাইবার তৎপরতা দেখা যাক—শেষ সিদ্ধান্ত হবে সংসদীয় ভোটের সাংবিধানিক নিয়মে।


তাহলে কি অনলাইন রাজনীতি মূল্যহীন?


একেবারেই নয়।


অনলাইন এখন রাজনৈতিক প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। রাজনৈতিক মতামত তৈরি, তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানো, জনমতকে প্রভাবিত করা এবং রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।


কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন—


অনলাইন উপস্থিতিকে বাস্তব ভোটের সমান ধরে নেওয়া হয়।


একটি দলের সাইবার উপস্থিতি যত শক্তিশালীই হোক, সেটি যদি মাঠের সংগঠন, প্রার্থী, ভোটার এবং নির্বাচনী বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে অনলাইন শক্তি শেষ পর্যন্ত অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক চিত্র তৈরি করতে পারে।


বিএনপি–জামায়াতের বর্তমান সমীকরণ তাই কী বলছে?


সমীকরণটি খুব সরল নয়।


বিএনপির রয়েছে বৃহত্তর সংসদীয় শক্তি ও সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট।


জামায়াতের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভোটভিত্তি এবং শক্তিশালী বিরোধী অবস্থান।


বিএনপির সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরীক্ষা।


জামায়াতের সামনে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণের পরীক্ষা।


আর অনলাইনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—


তারা কি বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হিসাব মিলিয়ে নিতে পারবে?


শেষ কথা: মাঠে শূন্য, অনলাইনে একশো—কথাটি কি পুরোপুরি সত্য?


রাজনৈতিক রসিকতায় কেউ কেউ হয়তো বলবেন—


“মাঠে শূন্য, অনলাইনে একশো।”


কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।


জামায়াত মাঠে শূন্য নয়—তাদের ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট এবং ৬৮টি সরাসরি আসনই তার প্রমাণ।


তবে এটিও সত্য যে অনলাইনের দৃশ্যমানতা সবসময় নির্বাচনী শক্তির সঠিক মাপকাঠি নয়।


২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই পার্থক্যটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।


রাজনীতির শেষ সমীকরণ তাই হয়তো এমন—


অনলাইন জনপ্রিয়তা + মাঠের সংগঠন + ভোটার আস্থা = নির্বাচনী শক্তি।


শুধু অনলাইন উপস্থিতি দিয়ে প্রথম সমীকরণ পূরণ করা যায়।


কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলতে হলে বাকি দুটি সমীকরণও পূরণ করতে হয়।


কারণ শেষ পর্যন্ত—


ফেসবুকের টাইমলাইনে নয়, ব্যালট বাক্সেই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়।


আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা আরও একবার সামনে আসছে—


অনলাইনের উত্তাপ যতই বেশি হোক, সংবিধানের অঙ্ক শেষ পর্যন্ত সংবিধানের নিয়মেই মেলে।