জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ ব্যয়ের ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে কাজ সম্পন্ন করা, শ্রমিক নিয়োগের পরিবর্তে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহার, বাধ্যতামূলক রেফারেন্স বেড ব্লক (RBB) ও টেম্পোরারি বেঞ্চ মার্ক (TBM) নির্মাণ না করা, কাগজে শতাধিক শ্রমিক দেখিয়ে বাস্তবে শ্রমিক না লাগানো এবং খালের দুই পাড়ের সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করার মতো অনিয়ম ঘটেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল খালের পানি প্রবাহ সচল রাখা, কৃষিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তবে বাস্তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে দায়সারা কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় রোয়াইর সুইচগেট থেকে বানদীঘি পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই খালের আরও ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে একই খালের জন্য মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
কার্যাদেশে খালের উপরিভাগের প্রস্থ ২২ থেকে ৩৫ ফুট, তলদেশের প্রস্থ ১০ থেকে ১২ ফুট এবং গভীরতা ৮ দশমিক ৫ থেকে ১১ ফুট রাখার নির্দেশনা ছিল। পাশাপাশি কাজের পরিমাপ নিশ্চিত করতে ১৩টি RBB ও ২৬টি TBM নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
তবে সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে খালের গভীরতা ও প্রস্থ অনুমোদিত নকশার সঙ্গে মিল নেই। অনেক জায়গায় কেবল উপরের পলি অপসারণ করেই কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। খননকৃত মাটি যথাযথভাবে সমতল না করায় বর্ষার পানিতে তা আবার খালে ধসে পড়ছে। প্রকল্প এলাকায় কাজের বিবরণসংবলিত কোনো সাইনবোর্ডও পাওয়া যায়নি। এছাড়া কার্যাদেশে উল্লেখিত RBB ও TBM-এরও কোনো অস্তিত্ব দেখা যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের অন্তত অর্ধেক কাজ শ্রমিক দিয়ে করার শর্ত থাকলেও বাস্তবে পুরো কাজই ৬টি ভেকু মেশিন দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় বহু শ্রমিক কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির এক সদস্য এবং এলজিইডির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের সুবিধার্থে ১৮০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদন বা নিলাম ছাড়াই খালের দুই পাড়ের বেশ কিছু মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মাত্রাই মুন্নাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, "অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ হয়নি। অল্প কিছু মাটি কেটে কোটি টাকার কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি পাড়ের বড় বড় গাছও কেটে নেওয়া হয়েছে।"
একই গ্রামের মোনোয়ার হোসেন বলেন, "শ্রমিক দিয়ে কাজ করালে অনেক মানুষের উপকার হতো। কিন্তু কয়েকটি ভেকু দিয়ে কাজ করায় গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়েছে।"
প্রকল্পটির তদারকি কর্মকর্তা ও এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, "কাজে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি, ভেকু দিয়েই কাজ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।" তবে RBB, TBM নির্মাণ এবং শ্রমিক ব্যবহার না করার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "সরকারি নকশা অনুসারেই কাজ করা হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতার কারণে কিছু জায়গায় সামান্য সমন্বয় করা হয়েছে।"
কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, "খাল পুনঃখনন প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। বর্তমানে মোট কাজের ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কাজ শেষে পুনরায় পরিমাপ করা হবে। কোথাও নকশার সঙ্গে অমিল পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী বিল সমন্বয় করে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়া হবে।" শ্রমিকের তালিকা সম্পর্কে তিনি জানান, সেটি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।